েফলে আসা শৈশব খণ্ড ঃ ৭ (বরিশাল জিলা স্কুল)

হারানো ছেলেবেলাটা কেমন ছিল আমার। খুব সাধারণ আর সাদামাটা। শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে একান্ত মায়ের সানিদ্ধে। বাবা জীবীকার তাগিদে সুদূর রাজধানীতে। আর আমার মা আমাদের দুই ভাই বোন কে নিয়ে পটুয়াখালীর মিজর্াগঞ্জ থেকে খুলনা, খুলনা থেকে বরিশালে পাড়ি জমিয়েছে। মা খুলনায় টিচার্স ট্রেইনিং ইন্সটিটিউশন এ পড়ত। মায়ের পড়াশুনা শেষ হতেই আমরা বরিশাল চলে এলাম। চলে এলাম বোন মা আর আমি এই তিনজনের প্রায় নিঃসঙ্গ নতুন শহরে। শুনেছি এই শহরেই আমাদের অনেক আত্মীয় স্বজন থাকে। মাঝে মাঝে তাদের দু এক জনার দেখা পাওয়াই আমার জন্য বিশাল আনন্দের ব্যাপার ছিল। ছিল রীতিমত উৎসবের। ১০০ ওয়াটের গোল লাইটের ক্যারামেল আলো নিভে গেছে আলেকান্দার দোতলা ঘরে। প্রতিদিনকার নিয়মে আজকেও বিদ্যুৎ চলে গেছে। হারিকেন আর মোমের আলো জ্বালানো হয়েছে। চারদিকে ভৌতিক আঁধারের মাঝে একটা ছোটো আলোর কুন্ডি জ্বলছে জেনো। আমরা তার পাশে সবাই ফ্লোরে মাদুর বিছিয়ে বসে আছি। কোন এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় হারিক্যান এর আলোতে আমাদেরকে শেখানো হচ্ছে “My country name is Bangladesh”। দড় দড় করে পিঠ বেয়ে ঘাম ঝরছে ভ্যাপসা গরমে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে জাওয়া জল আর ঘাম মিলে মিশে একাকার। এইবার বাংলাদেশ নামের অদ্ভুত দেশটার নাম ইংরেজিতে বানান করতে হবে। সম্ভাব্য প্রায় সব রকম ভুল বানান করছি। আর মনে মনে প্রশ্ন করছিলাম “বাংলাদেশ এর নাম এত বড় কেন রেখেছে?” তখন ছোট ফুপু থাকত আমাদের সাথে আমাদের তত্ত্বাবধান করার জন্য। ফুপু নানা রকম নিখুঁত উপায়ে শাস্তি দিত। আম্মা যাতে বুঝতে না পারে!  শাস্তি বেশ ভয়াবহ ছিল তাই সে মূলত কানের পাশের চুল ধরে টানা এবং লাল চিমটির মত কুৎসিত শাস্তি আমাদের দিত। আম্মা আর ফুপু দুইজনার শাস্তি দুই রকম। এই দু রকমের শাস্তিতে আমার প্রতিক্রিয়াও হত দুই রকম। আমার শাস্তি ছিল গালে চড় আর তীব্র ভতসনা করা। পারিবারিক এই শাস্তির ব্যাপারটি পরবর্তী জীবনে আমার সুদূরপ্রসারী রেখাপাত করেছিল। আশেপাশে অ্যাঁর কেউ না থাকায় হয়তো ভয়ে আমি প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ হয়ে পরতাম।

বছরের মাঝা মাঝি সময়ে আসার কারনে প্রথম বছরটা আরেকটা স্কুলে কাটিয়ে দেই। এর পরেই বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তির জন্য ভয়াবহ প্রস্তুতি যজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। একদিন ভোরে আমাকে বরিশাল জিলা স্কুলে নিয়ে জাওয়া হল। ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। আমাকে পুরোটা পথ জুড়ে নানা রকম উপদেশ আর শেষ সময়ের রিভিশন দেয়া হচ্ছিল। বিশাল একটা গেটের সামনে অসংখ্য মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার বয়সী অনেক ছেলে হাতে রং পেন্সিলের বাক্স আর কলম পেন্সিল নিয়ে  একটা সরু গেট দিয়ে ভেতরে যাচ্ছে বাবা মায়ের হাত ধরে। আমার ঝাপসা মনে আছে আমি খুবি চমৎকৃত হয়েছিলাম এক ছেলের হাতে একটা পৃথিবীর ছবি আঁকা একটা রঙ্গিন রংপেন্সিলের বাক্স দেখে। আম্মা আমাকে তাড়া দিচ্ছে এই দিক সেদিক না তাকিয়ে যেসব শিখিয়েছে সেগুলি জানি মনে করতে থাকি। কোনভাবেই অমনোযোগী হলে চলবে না। জিলা স্কুলে ভর্তি হতে না পারলে আব্বা ভীষণ বকা দিবে। আমাদেরকে পড়তে হবে নিম্নমানের কোন এক স্কুলে। কিন্তু আমার সব মনোযোগ কেরে নিয়েছিল সেই ছেলেটির অদ্ভুত সুন্দর রঙের বাক্স। আমারও যদি অমন কিছু একটা থাকতো। আমাদের কে ক্লাসের মধ্যে সিট প্ল্যান অনুযায়ী বসিয়ে দিয়ে অভিভাবকদের বের করে দেয়া হল ক্লাস রুম থেকে। ওই সময়টায় সত্যি অসহায় লাগছিল। আম্মা আরও অনেক অভিভাবকের সাথে ভিড়ে মিশে গেল। আমি জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি। দালানের বাইরে ফুলগাছের বাগানের পাশে সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে অনেকগুলি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারো মা বাবা আত্মীয় স্বজন।

আমাদেরকে প্রশ্নপত্র দেয়া হল। এক পৃষ্ঠার প্রশ্নপত্র ! আমাকে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র সম্পর্কে যে ধারনা দেয়া হয়েছিল তার সাথে এর কোন মিল নেই। আমি প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেলাম প্রশ্নপত্র পুরোটা না দেখেই। ভয়ার্ত আর অসহায় চোখ গুলি আনমনেই জানালার বাইরে আম্মাকে খুঁজে যাচ্ছে। যেন কোন একটা অভিযোগ এখুনি করে ফেলবে? “তুমি যেমন প্রশ্নের কথা বলেছিলে তেমনটা আসেনি কেন !”। হটৎ ভিড়ের মাঝে একটা হাত আমি খুঁজে পাই। আম্মার হাত! হাত নাড়িয়ে সে আমাকে খাতায় লিখতে বলছে। আমাকে জানালার বাইতে তাকাতে নিষেধ করছে! আম্মার পড়ানো অনেকগুলি প্রশ্ন খুঁজে পেয়েছিলাম। আজ আর মনে নেই সেই প্রশ্ন সবগুলির উত্তর দিয়েছিলাম কিনা। হটাৎ সামনের বেঞ্চের ছেলেটার দিকে চোখ যেতেই দেখি সে রং পেন্সিল দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ছবি আঁকছে। আমি ভেবেই পাচ্ছিনা ছেলেটা কেন ছবি আঁকছে। প্রশ্নে যে অংশটা আমার সব থেকে প্রিয় সেই অংশটাই দেয় নাই। মানে ছবি আঁকার কথাতো প্রশ্নে লেখা নেই। আমি ছেলেটার ছবি আঁকা মুগ্ধ হয়ে দেখছি। সে  গ্রামের ছবি আঁকছে। বাড়ির পিছে কলা গাছ। রাস্তার পাশে ধান ক্ষেত। কিন্তু সে একটি ভুল করে ফেলেছে। ধান ক্ষেতে গরু এঁকে ফেলেছে। এইটা একটা বিশাল ভুল। ধান ক্ষেতে গরু আঁকা যাবে না। গরু ধান গাছ খেয়ে ফেলবে। গরু আঁকতে হবে বাড়ির পাশে গোয়ালে। এইসব ভাবনায় ছেদ পড়লো। হলের গার্ড প্রচণ্ড বিরক্তি অ্যাঁর রাগ নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছে “এই ছেলে তুমি নিজের খাতায় ছবি আঁকছ না কেন, অন্যের ছবির দিকে তাকিয়ে আছ কেন?”। “স্যার আমার প্রশ্নে ছবি আঁকা আসেনি” আমার এমন বক্তব্যে সে যারপরনাই হতাশ হয়ে আমার প্রশ্ন উল্টিয়ে দেখাল যে কোথায় ছবি আঁকার কথা বলা আছে। আমি হতভম্ব হয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করি। ৫ টি ফলের ছবি আর একটি পাখির ছবি আঁকা শেষ করে আবার জানালায় চোখ যেতেই আম্মাকে দেখতে পাই আবার। আম্মা নিস্পলক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ছবি আঁকতে আমার প্রচণ্ড ভাল লাগতো। এই ভাল লাগা সীমা পরিসীমা ছিল না। আমার স্কুলের প্রতিটা খাতায় কোথাও না কোথাও একটা গ্রামের ছবি না হয় একটা গাছের ছবি আঁকা থাকতো। জীবনের এই প্রান্তে এসে আজো ভাবি হয়তো ছবি আঁকাটা চালিয়ে গেলেই ভাল হত। ওটাই হয়তো আমি উপভোগ করতাম। খুব ক্ষুদ্র এই ভাল লাগা গুলিকে উপেক্ষা করা ঠিক হয়নি। উপেক্ষা গুলি আজ দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফেরে।

Early childhoodসেবার আশ্চর্যজনক ভাবে হলেও আমি কিভাবে যেন বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। স্কুলের সাদা ইউনিফর্ম এর কাপড় পাঠিয়ে দেয় আব্বা ঢাকা থেকে। সাথে অনেক গুলি চমৎকার গল্পের বই। ইশপের গল্প সমগ্র, এডগাররাইজ বারজের টারজান সিরিজ সহ আর অনেক গুলি বই। প্রথম স্টুডিওতে যাই আমরা ছবি তুলতে। আমার আর আমার বোনের পাসপোর্ট সাইজ ছবি তোলা হয়। আমার বোন গোলাপি রং-এর ড্রেস এর বিখ্যাত স্কুল বরিশাল সদর গার্লস এ ভর্তি হয়। সাদা কালো সেই ছবি তোলাটা ছিল ওই বয়েসে আমার সব থেকে উত্তেজনার একটি বিষয়। আমারও একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি আছে !  স্কুলের প্রথম দিন আম্মা রিকশায় করে স্কুলে দিয়ে আসে। এর পরে আর কোনদিন আম্মা স্কুলে যায়নাই আমার সাথে। আমি একাই স্কুল থেকে বাড়ি আসার পথ বের করে একা একাই জাওয়া আসা করতাম। মাঝে মাঝে নতুন নতুন রাস্তা বের করতাম। ফিরতে ঘড়ি ধরা সময়ের বেশি হলেই আম্মা নানান প্রশ্ন করতো। আজ মন খারাপ করে স্মৃতির জানালায় বসে থাকলেও আর আমার হারানো সেই শৈশব ফিরে আসবে না।

 

 

* ছেলে বেলার এই গল্প গুলি আমার নিজের তাড়নাতেই আমি লিপিবদ্ধ করে রাখছি। যদি কখন স্মৃতি অবিশ্বাসীর মত আচরণ করে বসে ! দীর্ঘ লেখা কার বিরক্তির কারন হলে আমি দুঃখিত।
ঢাকা, উত্তরা জানুয়ারি ১৪, ২০১৫ ইং

 

Share your thoughts