প্রিয়তমা কন্যা ওয়াদিয়াত জামান,

মৃত্যু কতটা ভয়াবহ মানুষ তার জীবত দ্বশায় কখনো তা উপলব্ধি করার সুযোগ পায় না। তাকে অপেক্ষা করতে হয় সে ভয়াবহ ক্ষণটির জন্য। স্বাভাবিক মৃত্যু বলতে আমরা বার্ধক্য জনিত মৃত্যুকেই বুঝে থাকি। এর বাইরেও থাকে দুর্ঘটনা, রোগ, আত্মহত্যা ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটিতেই আছে বিষাদ, কষ্ট আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্প। এবার আমি আরেকটি মৃত্যুর গল্প বলি।

প্রেক্ষাপট ১৯৭১, হিমালয়ের একেবারে দক্ষিনে যেখানে পদ্মা আর যমুনা নদী মিলিত হয়েছে সেখানের মানুষেরা এবার তাদের দাবি আদায়ের সর্বোচ্চ শপথ নিয়েছে। বহু নিপীড়নে জর্জরিত, দরিদ্র, প্রায় বেশিরভাগই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ও মূলত শ্রমজীবি এই মানুষেরা ৭ই মার্চ রেডক্রস ময়দানে শপথ নিল পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি চির তরে মুছে আদি পরিচয় “বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠা করবে। সেই ভুখন্ডটি হবে তাদের একান্তই নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই জনপদের মানুষের রক্ত বিসর্জনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ। এই দীর্ঘ পথে তারা রক্ত ঝরিয়ে এসেছে। পাওয়ার হিসেবে তাদের খুব বেশি কিছু মিলেনি। এবার সেই মহেন্দ্রক্ষন, সব হিসেব মিলিয়ে নেবার। কিশোর থেকে বৃদ্ধ, কিশোরী থেকে বৃদ্ধা সবাই শপথের মন্ত্রে বলিয়ান। হয় স্বাধীনতা নয় মৃত্যু। বজ্র কঠিন সেই শপথের মুল্য এত ভয়াবহ ছিল যা মানুষের কল্পনার অতীত। মানুষের সব ইন্রিও দিয়ে তা অনুভব করতে চাইলেও সম্ভব নয় সে ভয়াবহতার উপলব্ধি করা। সেই ভয়াল সময় কে আঁকা যায়নি  কোনো চিত্র শিল্পীর নিখুঁত চিত্রে, বর্ণনা করা যায়নি কোনো শ্রেষ্ঠ কবির কবিতায় কিংবা কোনো শিল্পীর শ্রেষ্ঠতম বিষাদের সুরে। জনপদের পর জনপদ ধ্বংস হয়ে গেছে, কেউ রাখেনি মৃত মানুষের লাশের হিসেব। কিভাবেই বা সম্ভব এত লাশের হিসেব রাখা। আর ২-১ টি লাশের গল্পতো নয়, এ যে অস্ত্রের মুখে নিরস্ত্র কোটি মানুষের আবেগের বলিদান। কত মানুষ মারা গেছে তা জানতেই আমাদের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল পরিসংখ্যানের।

শুধু আবেগ আর ভালোবাসাকে পুঁজি করে মানব সভ‍্যতার  ইতিহাসে এমন যুদ্ধ হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই। পৃথির মানুষ আশ্চর্য হয়ে দেখল বাঙালি নামের একটি জাতি ঘোষণা দিয়ে ফেললো “তারা সংখ্যার হিসেবে ৭ কোটি, পাকিস্তান মিলিটারির কাছে কি ৭কোটি বুলেট আছে পুরো বাঙালি জাতি নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য?” তারা এও ঘোষনা দিল শেষ মুক্তিকামী বাঙালিটির মৃত্যু পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে বিজয়ের জন্য! পৃথির মানুষ এমন অদ্ভুত বেপরোয়া শপথ আর কখনো দেখেনি। অসম্ভভ এক আবেগের মুল্য দিতে হলো ৩০ লক্ষ প্রানের বিনিময়ে। কত পরিবার ধ্বংশ হয়ে গেছে, কত মা সন্তান হারা হয়েছে, কত স্ত্রী স্বামী-সন্তান হারা হয়েছে, কত পিতার বুক খালি হয়েছে সে হিসেব কোথাও লেখা সম্ভব হয়নি। কোনো দলিলে বর্ণনা দেয়া সম্ভব হয়নি ৭ লক্ষ সম্ভ্রম হারানো মা বোনের ইতিহাস। তোমার প্রিয় বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি কান্নায় ভেঁজা। এখানে প্রতি ইঞ্চি মাটিতে রক্তের দাগ।

কন্যা সাফিয়া ওয়াদিয়াত জামান
কন্যা সাফিয়া ওয়াদিয়াত জামান

তোমার মাতৃভূমির স্বাধীনতার ইতিহাস জানানো আমার এই চিঠিটির উদ্দেশ‍্য নয়। তোমাকে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক করে দেয়ার উদ্দেশে‍্যই এই চিঠিটি লেখা। আবেগ খুব প্রয়োজনীয় একটি মানবিক উপাদান বটে কিন্তু সেটি তোমাকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে। ১৯৭১ এ স্বাধীনতার পরে বাংগালী ৭২ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে নিরাপদে পাকিস্তান ফেরত যেতে দিয়েছিল। কারন সদ্য স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দের আবেগের কাছে প্রতিশোধের তাড়না মরে গিয়েছিল। তারা সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের জন্মের বিশ্বাসঘাতকদের। সেই ঘানি আজও টানছি অনেক ক্লান্তিতে, অনেক লজ্জায়। আজ আমি যখন এই চিঠি তোমাকে লিখছি তখন ৪২ বছর পরে একটি প্রহসনের বিচার বসেছে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের। যদিও প্রহসন, তাতেও যদি কিছুটা দায় কমে। কিন্তু না কমে নি বরং দায় আরো বেড়ে সেটা কালিমায় রুপান্তরিত হয়েছে মাত্র। আমি আমার নির্বাক অসহায়ত্ব নিয়ে দেখেছি এই দেশের আলোবাতাসে জন্ম নেয়া একদল মানুষ আজ বাংলাদেশের অস্তিত্বকে মেনে নিতে অসস্তি বোধ করে। তারা ঘুন পোকার মতই কুড়ে কুড়ে খায় আমার হৃদয়। আমার জামার হাতার আস্তিনের ময়লা কালো দাগের মতই এরা জন্ম নেয়, বেঁচে থাকে, ইতিহাসকে বিকৃত করে। তোমার বিচার বিবেচনার সাথে আবেগ কে গুলিয়ে ফেল না যেন।

আমার খুব ছোটবেলা কেটেছিল একটা অন্ধকার ধারনা নিয়ে। আমাকে শেখানো হয়েছিল রাজনীতি নোংরা ও ভয়ঙ্কর একটি ব্যাপার। আমিও আর তেমন কিছু জানতে পারিনি। আমার কৈশোর, যৌবন আর পরিনত সময়ের সবটাই কেটে গেছে এই না জানার অন্ধকারে। কোনো একটা ভয় আমাকে অন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস কাউকে না কাউকে এই ভয় ভেঙ্গে সত্যকে জানতে হয়। তুমি তোমার প্রজন্মকে সাথে নিয়ে সেই প্রচেষ্টাটা কর। তোমার ইচ্ছাকে মোহ মুক্ত রেখো। তুমি তোমার চাওয়াও সীমানকে চিনে রেখো। দেশকে ভালবেস ইতিহাসে দায়ভার নিয়ে, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

ভালো থেক।
*** যখন তুই এই চিঠিটি পড়বি তখন তুই অনেক বড়। আমার হটাৎ েতার বড়বেলা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। তাই চিঠিটা লিখলাম
জুলাই ১৬, ২০১৩
রামপুরা, ঢাকা